পুলিশের গুলিতে এক চোখ অন্ধ, অন্য চোখে ভয় কিশোরের

0
231

‘পোলাডার মুখের দিকে চাওন যায় না। চোখটা নিয়া ওর খুব কষ্ট হয়। কিন্তু কী করমু কিছুই বুঝতাছি না। আমি তো গরিব বাপ।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন হতভাগ্য পিতা আবুল কালাম। একপর্যায়ে যেন দমবন্ধ হয়ে আসে তার। কিছুক্ষণ থেমে থাকেন। তারপর গলা ঝেড়ে আবারও বলেন বাবা হিসেবে সন্তানের চিকিৎসা না করতে পারার যন্ত্রণার কথা।

কালামের এই যন্ত্রণার শুরু আরও এক বছর আগে। গত বছরের ৭ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫৪ শ্রমিকের প্রাণহানি হয়। লাশের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিক ও স্বজনদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পুলিশ গুলি ছুড়লে সেখানেই গুলি লাগে আবুল কালামের ১৬ বছরের সন্তান শাহপরানের বাঁ চোখে।

চোখ বাঁচাতে তখনই রাজধানীর একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয় শাহপরানের। কিন্তু শাহপরান তার দৃষ্টি শক্তি ফিরে পায়নি। চিকিৎসক স্বজনদের বলেছেন, দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করে চোখের মণিতে থাকা গুলি বের করা হলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

শাহপরানের বাবা আবুল কালাম বলেন, আবার অস্ত্রোপচার করতে ৮০ হাজার টাকা লাগবে। কিন্তু প্রথম দফায় ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ করেছেন তিনি। সেই ঋণ পরিশোধ করতে অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। টাকার অভাবে আর অস্ত্রোপচার হয়নি। এরপর থেকে শাহপরান এক চোখে গুলি নিয়ে বেঁচে আছে।

আবুল কালামের বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বারে। দেড় বছর আগে রূপগঞ্জে আসেন পুরো পরিবার নিয়ে। উপজেলার ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকায় একটি বাড়ি দেখাশোনার বিনিময়ে অর্ধেক ভাড়ায় বাসা নিয়ে থাকেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়কের কাজ করে কোনোভাবে সংসার চলে তাঁর।

সম্প্রতি ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকায় শাহপরানের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে কথায় কথায় জানা যায়, পুলিশের গুলিতে শাহপরানের এক চোখ হারানোর পর তাঁরা বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলেন না। এলাকার নেতৃস্থানীয় লোকজন তাঁদের মানা করেছেন। পুলিশি ঝামেলায় পড়ার শঙ্কা আছে।

কথা হয় শাহপরানের সঙ্গে। দেড় বছর আগে একবুক স্বপ্ন নিয়ে মা–বাবার সঙ্গে শহরে এসেছিল সে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ভর্তি হয় নবম শ্রেণিতে। তার মাস চারেক পরই হাসেম ফুডসে আগুনের ঘটনা ঘটে। সে দিনের কথা মনে হতেই চোখ ছলছল করে ওঠে তার। বাড়ির পাশেই আগুনে পুড়ছিলেন শ্রমিকেরা। বাইরে শত শত স্বজনের আর্তনাদ লাশের জন্য। কারখানার সামনে দিয়েই মসজিদে জুমার নামাজে যাচ্ছিল সে। তখন লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশের ছোড়া একটি ছররা গুলি এসে লাগে তার চোখে।

শাহপরান বলল, সম্প্রতি তার চোখের ব্যথা বেড়েছে। তবে নিজের চোখের ব্যথার চেয়েও সে বেশি কষ্ট পায় তার মা–বাবার জন্য। তাঁর ভাষায়, ‘আব্বারে ঘরে পাই না। দিন-রাইত কাম করেন। আম্মাও কামে লাগছে। ওনি কাম করতে করতে অসুস্থ হইয়া গেছেন। আমার লাইগা শোক করতে করতে দাদাতো মইরাই গেলেন। যত দুঃখ কষ্টেই থাকি, আমাগো বাইরের কারও লগে কথা কইতে মানা। আমরা নাকি লাশের লাইগা আন্দোলন করছি, জানতে পারলে পুলিশ নাকি আমাগো ধইরা নিয়া যাইব।’

নারায়ণগঞ্জের এডিশনাল পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আমীর খসরু গণমাধ্যমকে জানান, গত বছরের ৯ জুলাই দুপুরে একসঙ্গে সবগুলো লাশ বের করা হচ্ছিল। তখনই হাজার হাজার শ্রমিক, এলাকাবাসী এবং কিছু সুযোগসন্ধানী লোক কারখানার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। এতে একদিকে যেমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, অপরদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষেও উদ্ধার কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ কারখানায় লুটপাটও চালিয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তখন লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আর তাতেই লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা তখন শূন্যে শটগানের গুলি ছুঁড়ি। এতে কোনো কিশোরের চোখ অন্ধ হওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। এমনটি হয়ে থাকলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা খোঁজ নেব।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here