দোয়া: চেয়ে নেওয়ার সেরা মাধ্যম

0
103

সাজ্জাদ শরিফ
দোয়ার শাব্দিক অর্থ ডাকা, আহবান করা, প্রার্থনা করা, চাওয়া ইত্যাদি। আরেকটি অর্থে দোয়া ব্যবহৃত হয়, সেটি হলো, ‘মোনাজাত’। এছাড়াও কাউকে ডাকা, কোনো জিনিসের দাবি করা এবং আশ্রয় কামনার অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মোনাজাত শব্দটি আরেকটু অন্যরকম অর্থ প্রকাশ করে থাকে। মোনাজাতের আরেকটি অর্থ গোপনে কিংবা চুপি চুপি কথা বলা। হাদিসে নামাজকেও মোনাজাত বলা হয়েছে। যেমন হাদিসে এসেছে, যখন তোমাদের কেউ নামাজে থাকে, তখন সে তার প্রভুর সাথে মোনাজাতরত থাকে। [সহি বোখারি]

অন্য একবর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘যখন কেউ নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে তার প্রভুর সাথে মোনাজাতরত থাকে। তাই তার ভেবে দেখা উচিত, কীভাবে আর কী বলে মোনাজাত করছে!’

প্রতিটি বিষয়ই আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়ে থাকে। বর্ণিত শব্দে আল্লাহর কাছে দোয়া বা প্রার্থনা করার তিনটি পর্যায় রয়েছে। এক. আল্লাহর হামদ বা প্রশংসা করা; দুই. আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তিন. আল্লাহর কাছে দুনিয়ার কিছু চাওয়া।

এসব কিছুই আমাদের দুনিয়ার জীবনে অতি প্রয়োজনীয়। প্রতিটি মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর কাছে চাইতে পারি। সবগুলোই আমাদের প্রয়োজন হয়। দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হলে আমাদের সুস্বাস্থ্য, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি সবই দরকার হয়। আবার এসব কিছু পাওয়ার পর বান্দা হিসেবে আল্লাহর প্রশংসা করতেই হবে। সেই সাথে এসব নিয়ে চলাফেরা করতে হলে কিছুটা ভুল-ভ্রান্তি হয়ে গেলে সেজন্য তো ক্ষমা, দয়া আর অনুগ্রহের প্রয়োজন তো অবশ্যই আছে। তাছাড়া সাহায্য-সহযোগিতা, কামনা-বাসনা, ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাদি সবকিছুর জন্যেই আল্লাহকে ডাকা এবং তার কাছে প্রার্থনা করতে বলেছেন আল্লাহ নিজেই। সেইসঙ্গে তাঁকে ডাকলে সাড়া দেবার অঙ্গীকারও করেছেন তিনি। দোয়া করলে দোয়া কবুলের ওয়াদা করেছেন। কুরআনে তিনি বলেছেন— “আর তোমাদের প্রভু বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। নিশ্চয়ই যারা অহঙ্কারবশত ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে যাবে।” [সুরা: মোমিন, আয়াত: ৬০]

প্রিয়তম রাসুল সা.-এর উম্মতের বিশেষ সম্মানের সুবাদে আমাদের আমল কবুলের করার ওয়াদাও করা হয়েছে। হজরত কাব আহবার থেকে বর্ণিত আছে, আগেকার যুগে শুধু নবীদের দোয়া করতে বলা হতো। তখন নবীরা দোয়া করতেন এবং তাঁদের দোয়া কবুল করা হতো। কিন্তু প্রিয়তম রাসুল সা.-এর উম্মতের একক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এই যে, আগেকার নবীদের জন্য নির্ধারিত আদেশ এ উম্মতের সবার জন্যই খুলে দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে—
“হজরত নোমান বিন বাশির রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেছেন, দোয়া সবটাই ইবাদত। এরপর তিনি একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন। সেই আয়াতের অর্থ এই, “আর তোমাদের প্রভু বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। নিশ্চয়ই যারা অহঙ্কারবশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে ঢুকবে।” [সুরা: মোমিন, আয়াত: ৬০]

হাদিসে দোয়াকে ইবাদত বলা হয়েছে। কোরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ ‘তাফসিরে মাজহারি’তে উল্লেখ করা হয়েছে, এই হাদিসের অর্থ এটা হতে পারে, ইবাদতের নামই দোয়া। কিংবা প্রত্যেক ইবাদতই দোয়া। কারণ, কারো সামনে নিজের চূড়ান্ত দীনতা-হীনতা প্রকাশ করাকে ইবাদত বলা হয় । আর নিজেকে কারো মুখাপেক্ষী মনে করে তার সামনে সোয়ালের হাত বাড়ানো সবচেয়ে বড়ো হীনতা। যা ইবাদতের অর্থ। এভাবে প্রত্যেক ইবাদতের সারমর্ম তো এই, আল্লাহর কাছে ক্ষমা লাভ, জান্নাত কামনা, ইহ-পরকালে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা। প্রকৃত অর্থেই একজন মানুষ যখন বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে নিজের অভাবের কথা জানায়, নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে এবং চাওয়ার কথা বলে আল্লাহর অনুগ্রহে নিজের প্রয়োজন পূরণের আশা করে। একই সাথে এই বিশ্বাস রাখে, আল্লাহতায়ালা সর্বশক্তিমান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা এবং দয়ালু। তিনি যতো ইচ্ছে দিতে পারেন এবং তাঁর ভাণ্ডারে কোনো অভাব নেই। মানুষ তাঁর দানের মুখাপেক্ষী। তিনিই অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সব সৃষ্টিই তাঁর মুখাপেক্ষী। এই বিশ্বাস নিয়ে একজন মানুষ যখন আল্লাহর কাছে দু’হাত প্রসারিত করে, তখন তার দোয়া সবটাই ইবাদত হয়ে যায়।

দোয়া করার অসংখ্য ফজিলতের কথা হাদিসে এসেছে। হজরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন, আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে বেশি সম্মানিত কোনো বিষয় নেই। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত অন্য একহাদিসে রাসুল সা. বলেছেন, দোয়া ইবাদতের মগজ।

নবিজি আরও বলেছেন, “যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন।”

সবগুলো হাদিসই দোয়ার মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি হাদিসের মাধ্যমেই দোয়ার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। হাদিসের ভাষ্যমতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট, দোয়া কতোটা ফজিলতপূর্ণ আমল। দোয়ার মাধ্যমে মানুষের বড়ো বড়ো বিপদ দূর হয়ে যায়। চিরশত্রু শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা যায়। মানুষের দুশমনি থেকে নিরাপদ থাকা যায়। সর্বোপরি জালেম বা অত্যাচারী মানুষের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাছাড়া মানুষ কল্যাণ-মঙ্গলের জন্যে সারাজীবন মানুষ যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, দুঃখ-কষ্ট আর বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকার জন্যে যতোরকম সাধনা করে; এতোসব আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে সহজ, সফল আর কার্যকর ব্যবস্থা হলো দোয়া করা।

দোয়া করতে খুব করে আয়োজনও করতে হয় না। শত্রুর হাত থেকে বাঁচবার জন্যে, বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকার জন্যে, ছোটো-বড়ো সব প্রয়োজন পূরণের জন্যে দোয়া করা হয় খুবই কম। অথচ সব ক্ষেত্রেই দোয়া করতে বলা হয়েছে। আল্লাহর কাছে চাইতে বলা হয়েছে। কারণ, দোয়াই এসব বিপদ থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। আল্লাহর অনুগ্রহে দোয়ার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে খুব সহজেই। এসব কারণেই দোয়াকে মোমিনের হাতিয়ার বলা হয়েছে। কিন্তু যে আল্লাহর কাছে চায় না এবং দোয়া করে না, আল্লাহর তার ওপর অসন্তুষ্ট হন। রাগান্বিত হন। এই রাগ করার কারণ বান্দার অহঙ্কার। যখন কেউ নিজেকে বড়ো ও বেপরোয়া মনে করে দোয়া ত্যাগ করবে, তখনই এই শাস্তি প্রযোজ্য। দোয়া বর্জনকারীকে জাহান্নামের শাস্তির বাণী শোনানো হয়েছে। কারণ, অহঙ্কার করে দোয়া বর্জন করা কুফরের (অস্বীকারের) লক্ষণ। তাই সে জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়। নতুবা দোয়া ফরজ বা ওয়াজিব কোনো আমল নয়। দোয়া না করলে গোনাহ হয় না। তবে দোয়া করা সব আলেমের মতে মোস্তাহাব ও উত্তম একটি আমল এবং হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী বরকত লাভের কারণ। [মাজহারি]

দোয়া আল্লাহর কাছে নিজের অক্ষমতা এবং হীনতা প্রকাশের সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম। আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের সেরা উপায়। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং বড়ত্বের স্বীকৃতি এবং তাঁর করুণা কামনা করা। নিজের অপারগতা প্রকাশ করে তাঁর কাছে দোয়া করা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের এক উত্তমপন্থা। আল্লাহ দোয়া করতে বলেছেন, দোয়া কবুলের ওয়াদাও করেছেন। প্রিয় নবী তো সবসময়ই দোয়া করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, যার জন্যে দোয়ার দরোজা খুলে দেয়া হয়েছে, তার জন্যে রহমতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়েছে। [জামে তিরমিজি]

আপনার যেকোনো প্রয়োজনের কথা, অভাব ও চাওয়া, দাবি-দাওয়া সবই বলতে পারেন আল্লাহর কাছে। যদি আপনি কিছু পেতে চান, তাহলে মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে চান। দু’হাত পেতে চান তাঁর দুয়ারে। তিনি আপনাকে দান করবেন। কখনো নিরাশ হবেন না। আপনার কাজের শুরুতে চান, কাজের শেষে চান। মানুষের দুয়ারে নয়, শুধু তাঁর কাছেই চান। আপনি চাইতে চাইতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন; কিন্তু আপনার প্রভু দিতে গিয়ে কখনো ক্লান্ত হবেন না। আপনি নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন; কিন্তু আপনার প্রভু আপনাকে দিতে একটুও প্ররিশ্রান্ত হবেন না। তাঁর ভাণ্ডার একটুও ফুরোবে না। মাটির পৃথিবীতে যখন দুহাত তুলে দাও প্রভু দাও! তুমি আমায় দু’হাত ভরে দাও; বলে উচ্চারিত হবে আপনার কাতরধ্বনি! তখন আসমান থেকে বর্ষিত হবে নাও বান্দা নাও! মালিকের এই আশ্বাসবাণী! এটাই দোয়ার সবচেয়ে সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হওয়ার অনন্য সৌন্দর্য। দোয়া করা যেহেতু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং উপকারী একটি আমল, দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কল্যাণ লাভের মাধ্যম। তাই দোয়া করা প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের আমল হওয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here