কোরআন অধ্যয়ন করেন রাজা তৃতীয় চার্লস, আরবিতে স্বাক্ষরও করেন

0
255

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতাসীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ব্রিটেনের নতুন রাজা হয়েছেন তাঁরই পুত্র চার্লস। সিংহাসনে আরোহণের পর তার নাম হয়েছে রাজা তৃতীয় চার্লস। একই সঙ্গে তিনি ১৪টি কমনওয়েলথ দেশেরও রাজা হবেন। রাজা তৃতীয় চার্লসের বিষয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ৭৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত কয়েক দশক ধরে প্রয়াত রাজকুমারী ডায়ানার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদসহ নানা কারণে জনসাধারণের নজরেই রয়েছেন। নতুন এই ব্রিটিশ রাজা জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনীতি এবং ধর্মসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে নিজের মতামতের জন্যও সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে চার্লস বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে নিজের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন এবং খোলাখুলিভাবে মুসলিম ধর্মের প্রশংসা করেছেন।

লেখক রবার্ট জবসন তার ‘চার্লস অ্যাট সেভেন্টি: থটস, হোপস অ্যান্ড ড্রিমস’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটেনের নতুন এই রাজা ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন অধ্যয়ন করেন এবং মুসলিম নেতাদের কাছে লেখা চিঠিতে আরবি ভাষায় স্বাক্ষর করেন।

কয়েক যুগ আগে থেকেই রাজা তৃতীয় চার্লসকে ইসলাম সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলতে শোনা গেছে। ১৯৯৩ সালে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজে দেওয়া বহুল আলোচিত এক বক্তৃতার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘ইসলামের প্রকৃতি সম্পর্কে পশ্চিমে যদি অনেক ভুল বোঝাবুঝি থাকে, তবে ইসলামিক বিশ্বের কাছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সভ্যতার ঋণ সম্পর্কেও (আমাদের) অনেক অজ্ঞতা রয়েছে। এটি একটি ব্যর্থতা বলেই আমি মনে করি। ইতিহাস থেকে যা আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।’

চার্লস সতর্ক করে দিয়ে সেসময় বলেছিলেন, চরমপন্থাকে কেবল ইসলামের ‘বিষয়’ হিসাবে দেখা উচিত নয়। তিনি বলেছিলেন, এটি কেবল ‘ইসলামের একচেটিয়া অধিকার নয় বরং এটি খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মের একচেটিয়া বিষয়’।

২০১০ সালেও অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজে এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন চার্লস। সেখানে তিনি ইসলাম এবং কোরআন সম্পর্কে নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে কথা বলেন। বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির প্রাচুর্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ আরও বলেছিলেন, ‘এগুলো স্বেচ্ছাচারী বা অবাধ কোনো সীমা নয়, এগুলো সৃষ্টিকর্তার দ্বারা আরোপিত সীমা এবং কোরআন সম্পর্কে আমার উপলব্ধি সঠিক হলে, মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে- তারা যেন তাদের সীমা লঙ্ঘন না করে।’

একই বক্তৃতায় চার্লস বলেন, ‘আমরা এই গ্রহে খুব ভালো একটি কারণে সৃষ্টির বাকি প্রাণীগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করে বসবাস করি এবং তা হলো—আমাদের চারপাশের জীবনের যে জটিল ভারসাম্য রয়েছে সেটি ছাড়া আমরা নিজেরাই এখানে থাকতে পারি না। ইসলাম সর্বদাই এই শিক্ষা দিয়েছে এবং সেই শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে সৃষ্টির সঙ্গে আমাদের চুক্তি ভঙ্গ করা।’

হজরত মুহাম্মদ (স.)-কে ব্যঙ্গ করে ২০০৫ সালে একটি ড্যানিশ কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ঘটনার সমালোচনা করেছিলেন রাজা তৃতীয় চার্লস। ২০০৬ সালে মিশরের কায়রোতে অবস্থিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরের সময় এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চার্লস বলেন, ‘সংখ্যালঘু এবং অপরিচিতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই হলো একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত চিহ্ন। ডেনিশ কার্টুনের বিষয়ে সাম্প্রতিক ভয়ঙ্কর বিবাদ এবং ক্ষোভ আমাদের অন্যদের কথা শোনার ও অন্যদের কাছে যা মূল্যবান এবং পবিত্র তা সম্মান করতে ব্যর্থতার বিপদটিই দেখিয়ে দিয়েছে।’

রমজানের পবিত্রতা নিয়ে এপ্রিল মাসে রাজা চার্লস বলেন, সবাই ‘রমজানের চেতনা থেকে’ শিখতে পারে। এ সম্পর্কিত এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘শুধু উদারতাই নয়, সংযম, কৃতজ্ঞতা এবং প্রার্থনায় একতাবদ্ধতা বিশ্বজুড়ে অনেককে মহান স্বস্তি দেবে।’ 

রাজা তৃতীয় চার্লস দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে কাছাকাছি আনার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি বরাবরই বলে এসেছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর ‘ভুল বোঝাবুঝি’ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, আগেকার নবী-রাসুলদের মুজেজা সেই যুগে শেষ কিংবা পরিবর্তন হয়ে গেলেও পবিত্র কোরআন কোনোদিন পরিবর্তন হবে না। সংরক্ষিত থাকবে চীরকাল। পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত কিংবা অধ্যাপনা অনেক অমুসলিমের অন্তরেও আলাদা অনুভূতি তৈরি করে। এ ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এসব আসলে মহান স্রষ্টার কালামের প্রভাব।

একবার রাসুলুল্লাহ (স.) বায়তুল্লাহ শরিফে সুরা নাজম তেলাওয়াত করছিলেন। কাফেররা মুগ্ধ হয়ে তাঁর তেলাওয়াত শুনছিল। যখন সেজদার আয়াত এল, তখন শুধু নবীজি সেজদায় গেলেন না, তারাও সবাই সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। মক্কার কাফেররা প্রকাশ্যে অস্বীকার করলেও লুকিয়ে লুকিয়ে কোরআন শুনত! এটা কোরআনের অলৌকিক দিক।

জগদ্বিখ্যাত দেশ ব্রিটেনের রাজার কোরআন ও ইসলামপ্রিয়তা হয়ত তারই এক নমুনা। আল্লাহ তাআলা যথার্থই বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই কোরআন নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমিই তা সংরক্ষণ করব।’ (সুরা হিজর: ৯)

আল্লাহ তাআলা অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তারা কি কোরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? (সুরা মুহাম্মদ: ২৪)।  ‘এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে নাজিল হতো, তাহলে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেতো’ (সুরা নিসা: ৮২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here